দিগন্তজোড়া ধান কিংবা সরিষার হলুদে যখন ভরে ওঠে গ্রামবাংলা, তখন সেই দৃশ্যের সঙ্গে মিশে থাকে কৃষকের হাসি, ফসল ঘরে তোলার ব্যস্ততা আর নবান্নের উৎসব। কিন্তু সেই ফসলের পেছনে যাদের শ্রম ও ঘাম, জমির মালিকানায় তাদের কোনো হিস্যা নেই!
প্রজন্মের পর প্রজন্ম অন্যের জমিতে দিনমজুরের কাজ করেন তারা। ভোরের আলো ফোটার আগেই মাঠে নামেন। রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে ফসলের পরিচর্যা এবং মৌসুম শেষে আবার নতুন কাজের সন্ধানে বেরিয়ে পড়া, এভাবেই চলে যায় জীবন।
বলছিলাম জয়পুরহাটের পাঁচবিবি উপজেলার শিং ও মাহাতো সম্প্রদায়ের নারীদের কথা। কৃষির সঙ্গে যাদের সম্পর্ক আদিকাল থেকে, কিন্তু কৃষিজমির মালিকানা কিংবা ফসলের ভাগে তাদের অংশ খুবই সামান্য। মাঠে মাঠে সোনালি ধান, কিন্তু তাদের হিস্যা যায় কোনখানে?
নিজেদের জমি নেই। জীবিকার তাগিদে অন্যের জমিতেই ঘাম ঝরাতে হয় তাদের। ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মাঠে কাজ করেও দিনশেষে হাতে আসে মাত্র ৩শ থেকে ৪শ টাকা! অথচ একই কাজ করে একজন পুরুষ শ্রমিক পান ৪শ থেকে ৫শ টাকা। বৈষম্যের বাস্তবতায় নারীদের তাই জমির মালিক হওয়া ছিল স্বপ্ন!

দিনমজুর হিসেবে কাজ করছেন শিং ও মাহাতো সম্প্রদায়ের নারীরা
স্বপ্নের সেই গল্পেই এবার নতুন অধ্যায় লিখেছেন জয়পুরহাটের পাঁচবিবি উপজেলার শিং ও মাহাতো সম্প্রদায়ের ৬৫ জন নারী। অন্যের জমিতে শ্রম দেওয়া নারীরা এবারই প্রথমবারের মতো নিজেদের উদ্যোগে ফসল ফলিয়েছেন। শুধু ফসল ফলিয়েই থেমে থাকেননি, নিজেদের উৎপাদিত ফসল ন্যায্য দামে বিক্রি করে গড়েছেন নতুন নজির।
ব্র্যাকের চারটি গ্রাম উন্নয়ন সংগঠনের (ভিডিও) সঙ্গে যুক্ত শিং ও মাহাতো সম্প্রদায়ের ৬৫ জন নারী এবার একসঙ্গে নিজেদের জীবন বদলের পথে হাঁটছেন। সংগঠনের মাধ্যমে একজোট হয়ে তারা নিজেদের সঞ্চয়কে শক্তি বানিয়ে তা দিয়েই জমি ইজারা নিয়েছেন। এরপর বীজ কিনে সবাই মিলে চাষ করেছেন ‘ব্র্যাক ধান-২’ জাতের ধান। ব্র্যাক সিড অ্যান্ড এগ্রো এন্টারপ্রাইজ থেকে বিঘাপ্রতি ৩ কেজি করে বীজ কিনেছেন তারা।
সম্মিলিত শ্রমের ফলও দেখা মেলে মাঠজুড়ে। তাদের জমিতে মোট ৪৯ মেট্রিক টন ধান ফলেছে, যার মধ্যে ৪৮ মেট্রিক টনই তারা বিক্রি করেছেন! দিনমজুর হিসেবে অন্যের জমিতে কাজ করে জীবন চালানোর গল্প ধীরে হলেও বদলাচ্ছে। তারা এখন শুধু শ্রমিক নন, নিজেদের শ্রম-সঞ্চয়-সাহসে তারাই উৎপাদক!
আর বছর আমি জিরা ধান আবাদ করি। কিন্তু বাতাসে ধানের শীষগুলান পড়ে যায় আর ফলনও কম হয়। এইজন্য এই বছর ভালো জাতের ধান নিলাম, বাতাস দিলেও গাছগুলান যাতে নষ্ট না হয়।”
- রেণুকা রানী

প্রথমবারের মতো নিজের ফসল চাষ করছেন রেণুকা রানী
বীজতলা তৈরি থেকে চারা রোপণ, ক্ষেতের পরিচর্যা, ফসল কাটা ও বাজারজাত, কৃষিকাজের প্রতিটি ধাপেই তারা সরাসরি যুক্ত ছিলেন। সেজন্য ধান বিক্রির সময় স্থানীয় মধ্যস্বত্বভোগী বা পরিবারের পুরুষ সদস্যদের ওপর তাদের নির্ভর করতে হয়নি। আগে থেকেই নির্ধারিত ক্রেতা ও ন্যায্য দাম থাকায় নিজেদের উৎপাদিত ধান তারা বিক্রি করেছেন ব্র্যাকের কাছে, যা পৌঁছে যাবে শহরের ক্রেতাদের কাছে।
শুধু ফসল ফলানো নয়, তারা প্রকৃতি নিয়েও ভেবেছেন। চাষাবাদকে পরিবেশবান্ধব ও জলবায়ু-সহনশীল করতে জমিতে ব্যবহার করেছেন ‘অল্টারনেট ওয়েটিং অ্যান্ড ড্রায়িং’ (AWD) পদ্ধতি। এতে ফলন ঠিক রেখেই সেচের পানির ব্যবহার কমেছে প্রায় ৩০ শতাংশ। ক্ষতিকর রাসায়নিকের ব্যবহার কমাতে প্রাকৃতিক বালাই ব্যবস্থাপনায় নিয়েছেন ‘বার্ড পার্চিং’ পদ্ধতিও। অন্যের জমিতে শ্রম দেওয়া নারীরা এভাবেই হয়ে উঠছেন সচেতন, দক্ষ ও পরিবেশবান্ধব কৃষক।

বার্ড পার্চিং পদ্ধতি
খেতে এই ম্যাজিক পাইপটা বসানোর পর এখন আমি জমিতে রস আছে কি না দেখতে পারি। তাই সব সময় জমিতে পানি দিতে হয় না। এখন জমিতে পানিও কম লাগে আবার আবাদও ভালো হয়।”
- মিনা রানী

জমিতে পানির পরিমাণ দেখছেন মিনা রানী
জলবায়ু-সহনশীলতা ও উচ্চ ফলনের কারণে পরের মৌসুমেও তারা এ জাতের ধান চাষ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। পাশাপাশি জলবায়ু-সহনশীল চাষাবাদ পদ্ধতিগুলো ভবিষ্যতের চাষাবাদে ধরে রাখতে চান তারা। শিং ও মাহাতো সম্প্রদায়ের এই নারীদের জন্য এই পরিবর্তন কেবল বাড়তি কিছু আয়ের ব্যাপার নয়। এটি তাদের আত্মসম্মান ও স্বীকৃতির লড়াই। একসময় যে কাজে তারা ছিলেন সম্পূর্ণ অদৃশ্য, আজ সেখানে তারা নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।

এখন তারা সরাসরি ফসলের উৎপাদক
অন্যের আদেশে কাজ করা দিনমজুর নন আর তারা, এখন তারা সরাসরি ফসলের উৎপাদক। এটি শিং ও মাহাতো সম্প্রদায়ের নারীদের নিজেদের শক্তিতে ঘুরে দাঁড়ানো, নেতৃত্ব দেওয়া এবং স্বাবলম্বী হয়ে ওঠার এক নতুন গল্প।
নুসরাত জাহান ব্র্যাকের সমন্বিত উন্নয়ন কর্মসূচির রিসোর্স মোবিলাইজেশন অ্যান্ড কমিউনিকেশনস-এ ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত।
ইলমা ওয়াসীয়া আদৃতা ব্র্যাকের সমন্বিত উন্নয়ন কর্মসূচির কমিউনিকেশনস অ্যান্ড নলেজ ম্যানেজমেন্ট-এ সিনিয়র অফিসার হিসেবে কর্মরত।