লাভের বদলে লোকসান
ইমদাদুল হক একসময় ধান চাষে লাভের বদলে লোকসান গুনতেন। আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি ও সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা না থাকায় স্থানীয় ডিলারের গতানুগতিক এবং পুরাতন ধাঁচের পরামর্শের ওপরই তাকে নির্ভর করতে হতো।
আবার একই সাথে তার ধারণা ছিল না সঠিক পরিকল্পনা ও প্রয়োজন অনুযায়ী কৃষি ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে; এর অভাবে বীজ, সার ও বালাইনাশকে তার অনেক বেশি খরচ হতো। অনেক সময় ফসলের ধরন ও পোকার আক্রমণ বিবেচনা না করেই বালাইনাশক প্রয়োগ করায় ফুল ঝরে যাওয়া, গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়া এবং ফলন কমে যাওয়ার মতো সমস্যার সম্মুখীন হতেন তিনি।
পরিবর্তনের যাত্রা
গাজীপুরের সোহাগপুরের কাপাসিয়ার বাসিন্দা ইমদাদুলের কাছে কিছুদিন আগেও ধান চাষ লাভের চেয়ে প্রয়োজনের বিষয়ই ছিল। ধান চাষ তিনি করতেন কারণ ধানের খড় ছিল গরুর খাদ্যের একমাত্র ভরসা।
সোহাগপুরে ব্র্যাক মাইক্রোফাইন্যান্স কর্মসূচির ‘এগ্রি মডার্ন ভিলেজ’ প্রকল্পের আওতায় কৃষি বিষয়ক পরামর্শ পাওয়ার পর তার চাষাবাদে পরিবর্তন আসতে শুরু করে।
কৃষি নিয়ে ব্র্যাক মাইক্রোফাইন্যান্সের অনেক নতুন উদ্যোগের মধ্যে একটি হলো ‘এগ্রি মডার্ন ভিলেজ’ প্রকল্প। এর আওতায় মানিকগঞ্জ, নরসিংদি এবং গাজীপুরে কৃষকদের প্রদান করা হচ্ছে কৃষি বিষয়ক পরামর্শ, মানসম্মত বীজ, জৈব সার ও আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি বিষয়ক শিক্ষা।
এই প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত হয়ে কৃষি বিষয়ক বিভিন্ন পরামর্শ পাওয়ার পর বদলে যেতে শুরু করে ইমদাদুলের চাষাবাদ পদ্ধতি। পরামর্শের পাশাপাশি ব্র্যাক থেকে পাওয়া উন্নত জাতের ধানের বীজ ‘শক্তি’, জৈব সার ও ‘সোলার লাইট ট্র্যাপ’ ব্যবহার করে তিনি পোকামাকড় শনাক্তকরণ ও প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার পদ্ধতি অনুসরণ করেন।

ইমদাদ ভাইয়ের ফসলের মাঠ: ছায়াযুক্ত স্থানে ব্যাগে আদা চাষ

‘সোলার লাইট ট্র্যাপ’ আলো দিয়ে ক্ষতিকর পোকা আকৃষ্ট করে ফাঁদে ধরে; এতে রাসায়নিক কীটনাশকের ব্যবহার কমিয়ে পরিবেশবান্ধবভাবে পোকা নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
সাফল্যের শুরু
এর আগে তিনি ৩ কাঠা জমিতে বোরো ধান চাষ করে প্রায় ১০,০০০ টাকা খরচ করে মাত্র ৪,০০০ টাকায় ধান বিক্রি করতেন। ফলে ৬,০০০ টাকা লোকসান হতো। আর নতুন বীজ পেয়ে সেই একই পরিমাণ জমিতে ধান চাষ করে এখন খরচ ৩,৫০০ টাকা, বিক্রি ১০ হাজার টাকা। অর্থাৎ লাভ ৬,৫০০ টাকা!
এই সাফল্য তাকে সবজি চাষে আরও উৎসাহিত করল। ধানের পাশাপাশি পরবর্তীতে তিনি ২.৫ কাঠা জমিতে করলা চাষ করেন। এবার তিনি জৈব সার ও সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা (ফেরোমোন ফাঁদ, হলুদ আঠালো ফাঁদ ও জৈব বালাইনাশক) ব্যবহার করেন। ফলাফল?

ফেরোমোন ট্র্যাপ ক্ষতিকর পোকাকে আকৃষ্ট করে ধরে ফেলে, আর হলুদ স্টিকি ট্র্যাপ উড়ে আসা পোকা আটকে দেয়; ফলে রাসায়নিক কীটনাশক ছাড়াই ফসলের পোকা নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।
সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনায় তার বালাইনাশকের খরচ প্রায় ৮,০০০ টাকা থেকে কমে ২,৫০০ টাকায় নেমে আসে এবং মাত্র ৯০০০ টাকা বিনিয়োগে প্রায় ৬৫ হাজার টাকার করলা বিক্রি করে লাভ করেছেন ৫৫,০০০ টাকা! যেখানে আগের চাষ পদ্ধতিতে একই পরিমাণ জমি থেকে তিনি মাত্র ১২,৫০০ টাকার করলা বিক্রি করেছিলেন।
একইভাবে, মরিচ চাষেও তিনি বালাইনাশকের খরচ কমিয়ে আনেন এবং গত দুই মাসে মরিচ বিক্রি করেছেন ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকার।

ইমদাদ ভাই নিজের মাঠে মরিচ সংগ্রহ করছেন।
নতুন, উদ্ভাবনী এবং ব্যাপক পরিবর্তন এনে দেয়া এই কৃষি বিষয়ক সেবা ও পরামর্শে সাফল্য পেয়ে তিনি আরও উৎসাহিত হয়ে এখন তিনি ১ বিঘা জমিতে মরিচ, বেগুন, আদা ও হলুদসহ বিভিন্ন ফসলের মিশ্র চাষ করছেন। একই জমিতে একাধিক ফসল উৎপাদনের মাধ্যমে তৈরি হয়েছে আয়ের একাধিক পথ।
ইমদাদুল নিজেই এই পরিবর্তনে বিস্মিত! তার নিজের ভাষ্যেই শোনা যাক, "আগে খরচের টাকা ওঠার পর তো খুবই সীমিত লাভ থাকত; কোনো মৌসুমে মনে করেন ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা, আবার অনেক সময় সেটুকুও পাইতাম না। কিন্তু ব্র্যাকের সাথে যখন যুক্ত হইলাম, আমি প্রথমবারের মত সত্যিকারের লাভের মুখ দেখছি।"
চলতি মৌসুমের এই ৮ থেকে ৯ মাসের মধ্যেই ধান, করলা ও মরিচ চাষ করে ইমদাদুলের লাভ ১ লাখ টাকারও বেশি ছাড়িয়ে গেছে। আর মরিচ, বেগুন, আদা ও হলুদ থেকে তো পরবর্তী আরও ৩ থেকে ৪ মাস আয়ের সুযোগ এখনও রয়েছেই।

ব্র্যাকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ একাধিকবার পরিদর্শন করেছেন ইমদাদ ভাইয়ের ফসলের জমি
আমাদের দেশের একজন কৃষকের জীবনে পরিবর্তন আনতে প্রথম ধাপে তার নিজের ইচ্ছা এবং আগ্রহটা যেমন জরুরি, তেমনি তার পাশে থেকে সঠিক পরামর্শ, মানসম্মত ও উন্নত বীজ এবং এগুলো ব্যবহার করার সাহস জোগানোও সমান কার্যকর। কীভাবে একজন কৃষক অনিশ্চিয়তা থেকে নিজের জীবনকে একটি নিয়মিত আয়ের পথে নিয়ে আসতে পারেন, ইমদাদুল হকের এই পথচলা তারই একটি সুন্দর উদাহরণ।
লোকসানের শঙ্কা নিয়ে বেঁচে থাকা একজন কৃষক আজ স্বপ্নের পথে এগিয়ে চলেছেন!
লাভজনক ও টেকসই কৃষি আমাদের দেশকে বদলে দিতে পারে। কম খরচ এবং ঝুঁকিতে বেশি উৎপাদন এনে দেয় কৃষকের আয় বৃদ্ধি, তার পরিবারের আর্থিক নিশ্চয়তা এবং জাতীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব।
কৃষকদের জন্য ইমদাদুলের গল্প হোক অনুপ্রেরণা। পরিবর্তনের শুরু হোক নিজের জমি থেকেই!
রত্না সাহা ব্র্যাকের মাইক্রোফাইন্যান্স কর্মসূচির এগ্রি-ইনোভেশন টিমে কর্মরত আছেন।