সময়ের সাথে সাথে জীবন বদলায়। একের পর এক চেষ্টায় মানুষের পেশা জীবনের চিত্রও বদলে যায়। আধুনিক ধ্যানধারণা নতুন আশা জাগায়। মানুষ প্রয়োজনের তাগিদে বিকল্প পদ্ধতিতে কিছু করার আগ্রহ পরখ করতে চায়। আর যদি ভালো ফল আসে তাহলে তো কথাই নেই। এই যেমন দুই শতাধিক জেলে পরিবারের বাস সুনামগঞ্জের সুরমা পাড়ের টেঙ্গার গাঁওয়ে। বহু বছর ধরে এখানকার বাসিন্দাদের মাছ ধরাই কাজ। মাছ বিক্রি করেই চলে সংসার। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে আগে জাল ফেললেই মাছ উঠত কিন্তু এখন তেমন পাওয়া যায় না।
নদীর পানিতে ভাসমান খাঁচায় মাছ চাষ
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এভাবেই জেলেদের কারও কারও আয় কমিয়ে দিচ্ছে, বাড়িয়ে দিচ্ছে দুঃশ্চিন্তা। এমন বাস্তবতায় ১৩টি জেলে পরিবার নতুন এক সম্ভাবনার পথে হাঁটতে শুরু করেছেন, এখন তারা নদীর পানিতে খাঁচায় মাছ চাষ করছেন।
২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে প্রথমবারের মতো সুরমা পাড়ের জেলেরা ১৩টি খাঁচায় মোট ৭ হাজার ৮০০টি তেলাপিয়া মাছের পোনা ছাড়েন। ছোট ছোট পোনাগুলো ছয় মাস পর এতটাই বড় হলো যে গড়ে প্রায় কেজির কাছাকাছি। চলতি বছরের মার্চ-এপ্রিল মাসে তারা ১৩টি খাঁচা থেকে সব মিলিয়ে ৫ লাখ ৯২ হাজার ৫৩০ টাকায় ৩ হাজার 8০৯ কেজি মাছ বিক্রি করেন।
মাছ বিক্রির বেশিরভাগ অর্থ তারা একটি সমিতির মাধ্যমে সম্মিলিত ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা রাখেন। যাতে পরবর্তী মৌসুমে ওই টাকা দিয়ে মাছ চাষ করতে পারেন। এমনটাই কথা ছিল।
প্রথমবার ভাসমান খাঁচায় মাছ চাষে সফল মৎস্যচাষি ছাতকের আব্দুর রহমান। তিনিই দলের নেতা। তার কাছ থেকে জানা গেল আগে তারা শুধু নদীতে মাছ ধরতেন। এখন মাছ ধরার পাশাপাশি মাছ চাষও করেন। তিনি বলেন, নদীর পানিতে মাছের স্বাদ ভালো হয়, তাই খাঁচায় চাষ করা মাছের দাম বাজারে একটু বেশিই পাওয়া যায়।
যারা একসময় নদী, খাল ও হাওড়ে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতেন, তাদের খাঁচায় মাছ চাষে উদ্বুদ্ধ করতে সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার নোয়ারাই ইউনিয়নের টেঙ্গার গাঁওয়ে একটি ফোকাস গ্রুপ ডিসকাশন (এফজিডি) অনুষ্ঠিত হয়। ১৩ জন জেলেকে খাঁচায় মাছ চাষ করা শেখানো হয়। তবে শর্ত ছিল, প্রথম মৌসুমের মাছ বিক্রির অর্ধেক টাকা ব্যাংকে জমা রাখতে হবে পরবর্তী মৌসুমে মাছ চাষের জন্য।
তাদের ভাসমান খাঁচায় মাছ চাষের ওপর হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। ছাতকের সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. হানিফ উদ্দিন নিজে উপস্থিত থেকে প্রশিক্ষণ পর্যবেক্ষণ করেন। খাঁচায় মাছ চাষ করা ভালোভাবে শেখার জন্য পানির স্রোত, জালের ফাঁসের আকার, পানির গভীরতা, মাছের খাবার এসব নানা বিষয় জানতে হয়। তারপর ঠিক করতে হয় প্রতিটি খাঁচায় কী পরিমাণ মাছ চাষ করা হবে।
জলবায়ু সহনশীল মাছ হিসেবে তেলাপিয়া বা এই ধরনের মাছ খাঁচায় চাষের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত। কাজেই প্রথম মৌসুমে সেটাই চাষ করা হয়। তবে তেলাপিয়া ছাড়াও পাঙাশ, কোরাল (ভেটকি) ও কার্প জাতীয় মাছ খাঁচায় চাষ করা সম্ভব।

তেলাপিয়া মাছ
রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচর্যা
নদীর পাড়ঘেঁষা, বসতবাড়ির কাছাকাছি জায়গায় যেখানে পানির স্রোত কিছুটা কম এরকম পানিতেই খাঁচাগুলো রাখা হয়। মাছের জন্য এটা যেমন অনুকূল পরিবেশ, তেমনি পরিবারের সদস্যরা সহজে খাঁচাগুলো পাহারা দিতে পারে। সেইসঙ্গে খাঁচাগুলো সচল রাখতে নিয়মিত এর নেট (জাল) পরিষ্কার করতে হয়।
আসলে খাঁচায় সফলভাবে মাছ চাষ করতে প্রয়োজন বিশেষ যত্ন। নদীর পানিতে ভাসমান খাঁচা তৈরিতে প্রয়োজন হয় বাঁশের ফ্রেম, ঢাকনাযুক্ত জাল, খালি ড্রাম বা ব্যারেল এবং জিআই পাইপ। খাঁচার জাল এমনভাবে তৈরি করতে হয় যাতে কাঁকড়া, সাপ বা অন্যান্য জলজ প্রাণী তা নষ্ট করতে না পারে।
খাঁচায় মাছ চাষে কথা বলছি তাহলে খাঁচাটি কত বড়? দৈর্ঘ্যে ২০ ফুট, প্রস্থে ১০ ফুট বড় একটা ঘরের সমান ১৩টি খাঁচা ছয় ফুট গভীরে পাশাপাশি বসানো হয়। এরকম প্রতিটি খাঁচা তৈরিতে প্রায় ১৫-১৬ হাজার টাকা লেগেছিল আর ব্যবহার করা যেতে পারে প্রায় তিন বছর।
মাছ চাষিদের সাথে কথা বলে জানা গেল প্রতিটি খাঁচায় প্রায় ৩০০ কেজির মতো মাছ ছিল। এর জন্য খরচ করতে হয়েছে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা। মাছেদের বড় করার জন্য প্রতিটি খাঁচায় দিনে আড়াই কেজি ভাসমান পিলেট খাবার দেওয়া হতো।

খাঁচা থেকে মাছ সংগ্রহ
টেকসই জীবিকার পথ
এই খাঁচায় মাছ চাষের এই উদ্যোগটি সুরমা পাড়ের জেলেদের জন্য নতুন স্বপ্নের হাতছানি। একদিকে বিকল্প আয়ের পথ, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের কাছে মাছে-ভাতে বাঙালি প্রবাদ সত্য করে তুলছে। পুষ্টিমান ও স্বাদ উভয়ই ভালো।
সুনামগঞ্জের এই পাইলট উদ্যোগটি সফল হওয়ায় এটি বাংলাদেশের অন্যান্য হাওর ও নদী-অধ্যুষিত অঞ্চলে ছড়িয়ে দেওয়ার বিশাল সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। দেশের অন্যান্য এলাকার নদী পাড়ের বাসিন্দারাও চাইলে খাঁচায় মাছ চাষ করতে পারেন। এজন্য উপজেলা মৎস্য অফিস থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা ও প্রশিক্ষণ পাওয়া যেতে পারে।
কানিজ ফাতেমা-তুজ-জহুরা ব্র্যাকের জলবায়ু পরিবর্তন কর্মসূচিতে স্পেশালিস্ট (ফিশারিজ) হিসেবে কর্মরত।
কামরান ইবনে আবদুল কাদের ব্র্যাকের জলবায়ু পরিবর্তন কর্মসূচির কমিউনিকেশন অ্যান্ড নলেজ ম্যানেজমেন্ট ডিপার্টমেন্টে সিনিয়র স্পেশালিস্ট হিসেবে কর্মরত।

