স্যার ফজলে হাসান আবেদ মূল্যবোধ পুরস্কার ২০২৬ পেলেন যারা

তারিখ: 7 এপ্রি. 2026

লেখক: ব্র্যাক

ব্র্যাককর্মীদের সাফল্য ও কর্মদক্ষতার স্বীকৃতি প্রদান এবং মূল্যবোধ ধারণ, লালন ও চর্চায় উৎসাহিত করতে ‘স্যার ফজলে হাসান আবেদ মূল্যবোধ পুরস্কার ২০২৬’ প্রদান করা হয়েছে। ব্র্যাকের ৫৪ বছর পূর্তি উপলক্ষে ২রা এপ্রিল (বৃহস্পতিবার) ব্র্যাকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত ব্র্যাক-ডে ২০২৬-এর অনুষ্ঠানে এ পুরস্কার প্রদান করা হয়।

উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য পেশাদারিত্ব এবং সংস্থার মূল্যবোধসমূহের প্রতি সুষ্পষ্ট অঙ্গীকার জরুরি। কর্মীদের সেই অঙ্গীকারের স্বীকৃতি প্রদান করার উদ্দেশ্যে ২০১১ সালের ২রা ফেব্রুয়ারি ব্র্যাকের প্রধান কার্যালয়ে সর্বপ্রথম কর্মীদের মধ্যে ব্র্যাক ব্র্যান্ড অ্যাওয়ার্ড ও মূল্যবোধ চর্চার ওপর পুরস্কার প্রদান করা হয়। এই অনুষ্ঠানে স্যার ফজলে হাসান আবেদ ঘোষণা করেন, ব্র্যাককর্মীদের প্রশংসনীয় কাজ, মূল্যবোধ চর্চা এবং প্রকৃত অঙ্গীকারের স্বীকৃতিস্বরূপ প্রতিবছর মূল্যবোধ পুরস্কার প্রদান করা হবে। পুরস্কার প্রদানের উদ্দেশ্য হলো ব্র্যাককর্মীদের সাফল্য ও কর্মদক্ষতার স্বীকৃতি দেওয়া এবং কর্মীদেরকে মূল্যবোধগুলোর ধারণ, লালন ও মূল্যবোধ চর্চায় আরও উৎসাহিত করা।

ব্র্যাকের চারটি মূল্যবোধ যথা : সততা ও নিষ্ঠা, সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনী মনোভাব, সার্বজনীনতা এবং কার্যকারিতা ক্যাটাগরিতেই মূল্যবোধ পুরস্কার প্রদান করা হয়।

২০২৬ সালে ব্র্যাক বাংলাদেশের ১৪ জন কর্মী এবং ব্র্যাক ইন্টারন্যাশনালের ৬ জন কর্মী স্যার ফজলে হাসান আবেদ মূল্যবোধ পুরস্কার পেয়েছেন। সংক্ষেপে তাদের পরিচয় জেনে নিই।

২২ বছরের বেশি সময় ধরে নিষ্ঠা, সাহসিকতা ও পেশাদারত্বের সঙ্গে ব্র্যাক মাইক্রোফাইন্যান্স কর্মসূচিতে দায়িত্ব পালন করে চলেছেন মো. আব্দুল মতিন। একজন নিবেদিতপ্রাণ ও দক্ষ কর্মী হিসেবে ব্র্যাকের প্রতি তার অঙ্গীকারের সর্বোচ্চ প্রমাণ রেখেছেন। দুর্গম ও নদীবেষ্টিত চরাঞ্চলে নানা ধরনের প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে সদস্যদের পাশে দাঁড়ানো, ঝুঁকি নিয়ে নিরবচ্ছিন্ন সেবা প্রদান এবং নতুন গ্রাম সংগঠন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি আর্থিক অন্তর্ভুক্তির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তার দূরদর্শী নেতৃত্বে শুধু প্রতিষ্ঠান নয়, হাজারো সদস্যের জীবনেও ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। তিনি শুধু একজন দক্ষ কর্মকর্তা নন, একজন মানবিক মানুষ। প্রতিনিয়ত দুর্দশাগ্রস্ত সদস্যদের পাশে দাঁড়িয়ে সহমর্মিতা ও দায়িত্ববোধের অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন। নানা চ্যালেঞ্জ ও প্রতিকূল পরিস্থিতি সাহসিকতার সঙ্গে মোকাবিলা করে ব্র্যাকের ভাবমূর্তিকে আরও সুদৃঢ় করতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।

স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতের পাশাপাশি কঠোরভাবে প্রতিষ্ঠানের নীতিমালা অনুসরণ করার ক্ষেত্রে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত শাহিনা আক্তার। দীর্ঘ ২৮ বছর ধরে তিনি সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে মাইক্রোফাইন্যান্স কর্মসূচিতে অবদান রেখে চলেছেন। বর্তমানে তিনি কিশোরগঞ্জের বত্রিশ শাখার শাখা ব্যবস্থাপক হিসেবে সফলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও নীতির সঙ্গে আপস না করা, জীবননাশের হুমকির মুখেও অনৈতিকভাবে ঋণ প্রদান থেকে বিরত থাকার মতো অসংখ্য ঘটনা তার অসীম সাহসিকতা ও সততার পরিচায়ক। তার নেতৃত্বে যেমন টিমওয়ার্ক, সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনী চিন্তার বিকাশ ঘটেছে, তেমনি স্বীকৃতি হিসেবে একাধিকবার বেস্ট অ্যাওয়ার্ড, কোয়ালিটি লোন অ্যাওয়ার্ড এবং ফিমেল লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেছেন। পাশাপাশি তিনি সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি, নারীর ক্ষমতায়ন এবং সহকর্মীদের মধ্যে দক্ষ নেতৃত্ব গড়ে তুলতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছেন। মানবিকতা, পেশাদারত্ব ও অদম্য সাহসের এক অনন্য উদাহরণ শাহীনা আক্তার।

কর্মজীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে অসহায় ও প্রান্তিক মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন কানিজ ফাতেমা। ব্র্যাকে যোগ দেওয়ার পর থেকে একজন নিবেদিতপ্রাণ, মানবিক ও অনুপ্রেরণাদায়ী কর্মী হিসেবে আলট্রা-পুওর গ্রাজুয়েশন প্রোগ্রামে কাজ করছেন। সদস্যদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, চিকিৎসা সহায়তা নিশ্চিত করা এবং তাদের স্বাবলম্বী করে তুলতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার ও সুরক্ষা নিশ্চিতে কমিউনিটি পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধিতে রেখেছেন অনবদ্য ভূমিকা। পাশাপাশি ধর্মীয় ও সামাজিক নেতাদের সম্পৃক্ত করেছেন এবং প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তা প্রাপ্তিতে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। এমনকি নিজের রক্ত দিয়ে জীবন বাঁচানোর প্রয়োজন হলেও কখনো পিছুপা হন না। তার উদ্যোগে বহু অসহায় মানুষ স্বাবলম্বী হয়েছেন, পেয়েছেন জীবনের নতুন দিশা। সহমর্মিতা, নেতৃত্ব ও দায়িত্ববোধের এই অনন্য সমন্বয় তাকে করে তুলেছে সত্যিকারের একজন মানবিক মানুষ।

একজন সাহসী, দায়িত্বশীল ও মানবিক ব্র্যাককর্মী মোজাম্মেল হক। ২০২৪ সালে ফেনীর ভয়াবহ বন্যার সময় তার অসাধারণ নেতৃত্ব ও মানবিকতা সত্যিকার অর্থেই অনুকরণীয় হয়ে ওঠে। জীবনের ঝুঁকি উপেক্ষা করে তিনি সহকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে কাজ করেন, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র রক্ষা করেন এবং মাঝরাতে বিপদগ্রস্ত মানুষদের আশ্রয় দেন। তার উদ্যোগে প্রায় ৫০ জন অসহায় নারী-পুরুষের নিরাপদ আশ্রয় ও খাবারের ব্যবস্থা করা হয়। শুধু তাই নয়, উত্তাল বন্যার পানিতে তিনি ও তার টিম নিরলসভাবে ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করেন। মানবিকতার এই দৃষ্টান্ত এখানেই শেষ নয়। সে সময় ক্ষুধার্ত প্রাণীকে আশ্রয় দিয়েও সহমর্মিতার অনন্য উদাহরণ স্থাপন করেন। দুর্যোগ-পরবর্তী সময়ে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের পুনর্বাসনে রাখেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। পেশাগত দায়িত্বের পাশাপাশি সহকর্মীদের প্রতি তার আন্তরিকতা, সততা ও উদ্ভাবনী উদ্যোগ তাকে আরও বেশি অনন্য করে তুলেছে। তার নেতৃত্বে পরিচালিত ত্রাণ কার্যক্রম স্থানীয় প্রশাসনের প্রশংসা অর্জন করে।

সুমা রানী দাস এমন একজন সৃজনশীল, সৎ ও দায়িত্বশীল ব্র্যাককর্মী, যিনি কর্মদক্ষতা ও উদ্ভাবনী উদ্যোগের মাধ্যমে ব্র্যাকের অগ্রযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন। মাইক্রোফাইন্যান্স কর্মসূচিতে যোগদানের পর থেকে কর্মক্ষেত্রে বারবার নিজের দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন। নতুন এলাকা জরিপ, সদস্য বৃদ্ধি এবং ঝুঁকি হ্রাসে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের সার্বিক উন্নয়নে তিনি বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন। ২০২৪-২৫ সালের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্ত করা এবং সদস্যদের বিমার আওতায় আনা তার দূরদর্শী পরিকল্পনার প্রতিফলন। পাশাপাশি তিনি সদস্যদের আর্থিক সচেতনতা বৃদ্ধি করে চড়া সুদের ঋণ থেকে মুক্তির পথ দেখিয়েছেন। সততা ও স্বচ্ছতার ক্ষেত্রে তিনি এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। হারানো অর্থ যথাযথভাবে ফেরত দেওয়া এবং আর্থিক অনিয়ম সংশোধনে তার দায়িত্বশীলতা ব্র্যাকের প্রতি মানুষের আস্থা আরও দৃঢ় করেছে। সহকর্মীদের প্রতি সম্মান, সহযোগিতা ও নেতৃত্বের মাধ্যমে তিনি শক্তিশালী টিম গড়ে তুলেছেন, যেখানে কর্মদক্ষতায় পিছিয়ে পড়া কর্মীদের উন্নয়নেও নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।

অনন্য এক অনুপ্রেরণার প্রতীক আছমা আক্তার। বাল্যবিয়েতে রাজি না হওয়ায় শৈশবে বাড়ি ছেড়ে মামার বাড়িতে আশ্রয় নিতে হয়েছিল। এরপর নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন। দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিলেন একদিন সমাজের অসহায় ও বাল্যবিয়ের শিকার কিশোরীদের পাশে দাঁড়াবেন। সে লক্ষ্যে কাজ করে গেছেন। স্থানীয় মেম্বার, চেয়ারম্যান এবং সমাজসেবা কর্মকর্তাদের সঙ্গে সমন্বয় করে অসংখ্য সুবিধাবঞ্চিত মানুষকে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সেবার আওতায় এনেছেন। কর্মসূচির বাইরেও নারীর ক্ষমতায়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। ২০১২–২০২৫ সাল পর্যন্ত তিনি সংগ্রামী ও সফল নারীদের খুঁজে তাদের জীবনকাহিনি লিখে মহিলা অধিদপ্তরে পাঠিয়েছেন। তার উদ্যোগে পাঁচটি ক্যাটাগরিতে মোট ৩৫ জন নারী উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে জয়িতা পুরস্কার অর্জন করেছেন। এই অবদানের জন্য মহিলা অধিদপ্তর থেকেও তিনি প্রশংসিত হয়েছেন। এ ছাড়া তিনি নিজেও ২০১৭ সালে বরিশাল সদর উপজেলা থেকে শিক্ষা ও চাকরি ক্ষেত্রে অবদান রাখায় জয়িতা পুরস্কার লাভ করেছেন।

ব্র্যাক লার্নিং সেন্টারের একজন নিবেদিতপ্রাণ ও দায়িত্বশীল কর্মী মন্টু দেবনাথ। যিনি সততা, আন্তরিকতা ও পেশাদারত্বের মাধ্যমে অসংখ্য ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে চলেছেন। অতিথি ও প্রশিক্ষণার্থীদের হারিয়ে যাওয়া মানিব্যাগ, স্বর্ণালংকারসহ মূল্যবান সামগ্রী দ্রুততম সময়ের মধ্যে অপারেশন ম্যানেজারের কাছে হস্তান্তর করা তার নিয়িমিত দায়িত্ব। এ ক্ষেত্রে তিনি সততা ও দায়িত্ববোধের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। ভোরের আলো ফুটতেই অফিসে এসে নিজ উদ্যোগে ক্যাম্পাস পরিষ্কার, সৌন্দর্যবর্ধন, গাছপালা ও পুকুরপাড়ের যত্ন নেওয়া তার প্রতিদিনের কাজ। পাশাপাশি সহকর্মীদের সঙ্গে সমন্বয় করে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন, অতিথি ও প্রশিক্ষণার্থীদের সেবা নিশ্চিত করা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে সহায়তা প্রদানে তিনি সদা প্রস্তুত। বৈষম্যহীন আচরণ ও সহানুভূতিশীল মনোভাবের জন্য তিনি সবার কাছে প্রিয়। কোভিড-১৯ মহামারির সময়েও তিনি নিজের ঝুঁকি উপেক্ষা করে দায়িত্ব পালন করেছেন। তার কাজ ব্র্যাকের মূল্যবোধকে ধারণ করে এবং প্রতিষ্ঠানের সুনাম বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

অর্থ ও হিসাব বিভাগের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে মো. জাহাঙ্গীর আলম প্রতিটি ক্ষেত্রে ব্র্যাকের মূল্যবোধকে বাস্তবে রূপ দিয়েছেন। সততা, দায়িত্ববোধ ও পেশাদারত্বে তিনি একজন উজ্জ্বল উদাহরণ। কোভিড-১৯ মহামারির সময় অফিস কার্যক্রম সচল রাখার পাশাপাশি আর্থিক সহায়তা ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম বিতরণ তিনি দক্ষতা ও স্বচ্ছতার সঙ্গে পরিচালনা করেছেন। তার সৃজনশীলতা ও উদ্যোগী মনোভাব কর্মক্ষেত্রে বিশেষভাবে প্রশংসিত। অফিসে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে গুগল মিট, গুগল শিটসহ বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম চালু করে যোগাযোগ ও রিপোর্টিংকে আরও সহজ ও কার্যকর করেছেন। এ ছাড়া তিনি সহকর্মীদের দক্ষতা উন্নয়নে প্রশিক্ষণ, ফিডব্যাক ও সহযোগিতার মাধ্যমে একটি শক্তিশালী টিম গড়ে তুলেছেন। সময়মতো বেতন, বিল, ভ্যাট ও ট্যাক্স পরিশোধ এবং আর্থিক স্বচ্ছতা বজায় রেখে প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা আরও সুদৃঢ় করেছেন। তার সম্মানজনক আচরণ ও ধৈর্যশীল মনোভাব তাকে সবার কাছে নির্ভরযোগ্য করে তুলেছে।

অস্থায়ী কর্মী হিসেবে যাত্রা শুরু করে নিষ্ঠা, শৃঙ্খলা ও সততার মাধ্যমে নিজেকে একজন দক্ষ ও দায়িত্বশীল কর্মী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন আরতি রানী পাল। বিভিন্ন কর্মসূচিতে সফলভাবে দায়িত্ব পালনের পর বর্তমানে মাইক্রোফাইন্যান্স কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন। মাঠপর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে তিনি মানুষের জীবনের বাস্তব চিত্র কাছ থেকে দেখেছেন এবং ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে সদস্যদের স্বাবলম্বী করে তোলার ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা পালন করেছেন। তার কর্মজীবনের অন্যতম শক্তি হলো মানবিকতা ও সাহসিকতা। প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও দায়িত্ব পালনে অটল থেকেছেন এবং ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি মোকাবিলা করে পেশাদারত্বের পরিচয় দিয়েছেন। একইসঙ্গে সামাজিক সমস্যা সমাধানেও তিনি সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। দাম্পত্য বিরোধ মীমাংসা থেকে শুরু করে অসহায় পরিবারকে সুদের ফাঁদ থেকে মুক্তির পথ দেখানো তার মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির উজ্জ্বল উদাহরণ। করোনাকালে তিনি মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে খাদ্য ও সুরক্ষা সামগ্রী বিতরণ এবং সচেতনতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তার কর্মদক্ষতার স্বীকৃতিস্বরূপ একাধিকবার পুরস্কৃত হয়েছেন।

আলট্রা-পুওর গ্র্যাজুয়েশন কর্মসূচির একজন নিবেদিতপ্রাণ ও দায়িত্বশীল কর্মী ফারহানা ইয়াসমিন শান্তা মাঠপর্যায়ে বাস্তবসম্মত ও টেকসই উদ্যোগের মাধ্যমে সদস্যদের জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছেন। তিনি সদস্যদের সঞ্চয় বৃদ্ধি ও বিকল্প আয়ের পথে উদ্বুদ্ধ করার পাশাপাশি দুর্যোগ ও বিপর্যয়ের সময় পাশে থেকে তাদের পুনরায় ঘুরে দাঁড়াতে সহায়তা করে যাচ্ছেন। তার দিকনির্দেশনায় অসংখ্য পরিবারে নতুন করে আয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে এবং স্বচ্ছলতা ফিরে এসেছে। শিক্ষার গুরুত্ব অনুধাবন করে তিনি নিজ উদ্যোগে বস্তির শিশুদের মাঝে শিক্ষা উপকরণ বিতরণ করেছেন। পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব কার্যক্রম, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু সহনশীল কৃষির প্রসারে সক্রিয়ভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। তার মানবিকতা, উদ্ভাবনী চিন্তা ও দায়িত্বশীলতা শুধু সদস্যদের স্বাবলম্বী করেনি, বরং ব্র্যাকের ইতিবাচক ভাবমূর্তিকে আরও সুদৃঢ় করেছে।

শেখ মিতু ব্র্যাকের মূল্যবোধকে প্রতিনিয়ত কাজের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করে চলেছেন। অর্থ ও হিসাব বিভাগের কর্মী হিসেবে ‘হিসাবে স্বচ্ছতা, ইআরপিতে দক্ষতা এবং সেবাতে মুগ্ধতা’ এই মূলমন্ত্র তিনি আন্তরে ধারণ করেন। ২০২২ সালের ভয়াবহ বন্যার সময় তার মানবিকতা ও সাহসিকতা বিশেষভাবে প্রতিফলিত হয়। তার এলাকা প্লাবিত হলে নিজ বাসার গেট খুলে দিয়ে প্রায় ১৪০-১৫০ জন মানুষকে আশ্রয় দেন এবং নিজের কক্ষেও থাকতে দিয়েছিলেন ৩৫ জনকে। শুধু আশ্রয়ই নয়, তিনি নিজ উদ্যোগে তিনদিন খাদ্য ও প্রয়োজনীয় ওষুধের ব্যবস্থা করেন। একই সঙ্গে ব্র্যাকের ত্রাণ কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে দুর্গম এলাকায় ঝুঁকি নিয়ে ত্রাণ পৌঁছে দেন। পাশাপাশি সেবার মানোন্নয়নে তিনি সবসময় গ্রাহকবান্ধব আচরণ বজায় রাখেন। বিশেষ করে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও অন্তঃসত্ত্বা নারী গ্রাহকদের প্রতি সংবেদনশীল থেকে দ্রুত ও সহানুভূতিশীল সেবা প্রদান করেন। শেখ মিতুর সততা, মানবিকতা ও কর্মনিষ্ঠা সহকর্মীদের জন্য অনুপ্রেরণা এবং ব্র্যাকের ইতিবাচক ভাবমূর্তি আরও সুদৃঢ় করেছে।

মাঠপর্যায়ে বাস্তবমুখী সমাধান প্রদানের জন্য পরিচিত মরিয়ম সুখী। আলট্রা-পুওর গ্র্যাজুয়েশন প্রোগ্রামে যোগদানের পর থেকে তিনি সততা, মানবিকতা এবং উদ্ভাবনী চিন্তার মাধ্যমে কর্মসূচি বাস্তবায়নে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। একদিকে তিনি সদস্যদের পাশে থেকে বহুমুখী চাষাবাদ ও জৈব পদ্ধতির ব্যবহার করে টেকসই আয়ের পথ তৈরিতে সহায়তা করেন। অন্যদিকে মানবিক সহায়তায়ও তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করে যাচ্ছেন। অসুস্থ শিশুর চিকিৎসার জন্য অর্থ ও রক্তের ব্যবস্থা, থ্যালাসেমিয়ার রোগীর চিকিৎসায় সহায়তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছেন। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় তার নেতৃত্ব ও সাহসিকতা বিশেষভাবে প্রশংসনীয়। ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের সময় ঝুঁকি উপেক্ষা করে মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছে দেওয়া এবং ক্ষতিগ্রস্ত সদস্যের ঘর পুনর্নির্মাণে বিভিন্ন উৎস থেকে সহায়তা নিশ্চিত করা তার দায়িত্ববোধের প্রমাণ। পাশাপাশি প্রতিবন্ধী শিশুদের চিকিৎসা ও শিক্ষায় অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রেও তিনি কার্যকর ভূমিকা রেখেছেন। এ সব কাজের মাধ্যমে তিনি মাঠপর্যায়ে ব্র্যাকের মূল্যবোধ বাস্তবায়ন করেছেন এবং মানুষের আস্থা আরও দৃঢ় করেছেন।

সততা ও নিষ্ঠাকে মো. শরিফুল ইসলাম সর্বদা দায়িত্ববোধ হিসেবে বিবেচনা করেছেন। মিঠাপুকুর থেকে সাড়ে ৬ লাখ টাকা তোলার সময় অতিরিক্ত ৫০ হাজার টাকা পেয়ে দ্রুত সেটা ব্যাংকে ফেরত দিয়ে ব্যাংক কর্মকর্তাদের প্রশংসা কুড়িয়েছে। ২০১২ সালে অফিসের সামনের সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিকে হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করে মানবিক সহমর্মিতার পরিচয় দেন। ২০১৮ সালে সলঙ্গা অফিসে ফাইল ও বিল ভাউচার সংরক্ষণে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করে সময় ও কর্মশক্তি বাঁচান, যা অন্যান্য শাখার জন্য অনুসরণযোগ্য উদাহরণ হয়। এ ছাড়া সিরাজগঞ্জে ২০২২ সালে ঋণ বিতরণের সময় মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হলেও অফিসের ৪ লাখ টাকা রক্ষা করতে সক্ষম হন। প্রায় ১০ মাস চিকিৎসা শেষে পুনরায় কর্মস্থলে যোগদান করেছেন। শরিফুল ইসলামের সততা, উদ্যোগ, মানবিক সহমর্মিতা এবং বিপদের সময়ে দায়িত্ব গ্রহণের মানসিকতা ব্র্যাকের নৈতিক মূল্যবোধের অনুকরণীয় প্রতিচ্ছবি।

সততা, মানবিকতা ও সৃজনশীলতার এক অনন্য উদাহরণ স্থাপন করেছেন মো. আলমগীর মিয়া। বহুমুখী সামাজিক সমস্যা সমাধানে যেমন সৃজনশীলতার পরিচয় দিয়েছেন, তেমনি সততা ও সাহসের সঙ্গে সব ধরনের প্রলোভন, হুমকি-ধমকি উপেক্ষা করে অসহায় মানুষকে আইনি সহায়তা পেতে সহায়তা করেছেন। বাসের ড্রাইভার-হেলপারের কাছে নির্যাতনের শিকার হতে যাওয়া নারীকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে উদ্ধার করে নিরাপদে বাড়িতে পৌঁছাতে সহায়তা করেছেন। পাশাপাশি ধর্মান্তরিত নারীর পারিবারিক নির্যাতন বন্ধে স্থানীয় কাউন্সিলর ও থানার সহযোগিতায় নিরাপদে বসবাসের নিশ্চয়তা প্রাপ্তিতে সহায়তা করেছেন। এ ছাড়া মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আহত সদস্যকে হাসপাতালে নিয়ে রাতভর চিকিৎসা করানো, হিল্লা বিয়ে বন্ধ করা এবং ঋণ আদায়ে সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে দায়িত্বশীলতা ও মানবিকতার উদাহরণ স্থাপন করেছেন। মো. আলমগীর মিয়ার সততা, সাহসিকতা ও উদ্ভাবনী উদ্যোগ ব্র্যাকের মূল্যবোধের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।

আরিন্দা লয়েস ২০১৫ সালে প্রকিউরমেন্ট অফিসার হিসেবে ব্র্যাকে যোগদানের পর থেকে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা ও পেশাদারত্বের সঙ্গে জটিল ক্রয় প্রক্রিয়াগুলো পরিচালনা করছেন। সম্ভাব্য স্বার্থের দ্বন্দ্ব এবং বাহ্যিক সরবরাহকারীদের চাপ মোকাবিলা করে তিনি অত্যন্ত সততা ও দক্ষতার সঙ্গে কাজ করে চলেছেন।

ব্র্যাক লাইবেরিয়ায় হাওয়া ফ্রিম্যান এমন একজন মানুষ হিসেবে পরিচিত, যিনি দক্ষতার সঙ্গে যে কোনো সমস্যার সমাধান করতে সক্ষম। ইবোলা ও করোনা মহামারির মতো সংকটময় সময়েও তিনি তার কাজের মাধ্যমে কমিউনিটির আস্থা অর্জন এবং শতভাগ কিস্তি আদায় নিশ্চিত করেছেন। বর্তমানে তিনি প্রায় ৪ হাজার ঋণগ্রহীতার একটি পোর্টফোলিও পরিচালনা করছেন।

শরিফা ইউসুফ মখাওয়া একটি জাতীয় পর্যায়ের কমপ্লায়েন্স কাঠামো গড়ে তুলে বিচ্ছিন্নভাবে পরিচালিত কাজগুলোকে একটি সুসংগঠিত ও শক্তিশালী ব্যবস্থার আওতায় এনেছেন। ফলে ৪০টিরও বেশি শাখায় গ্রাহকদের আস্থা বেড়েছে। একটি ভয়াবহ ডাকাতির সময় তার নেওয়া দ্রুত ও দৃঢ় পদক্ষেপ সংবেদনশীল তথ্য নিরাপদ রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এতে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকা গ্রাহকদের তথ্য সুরক্ষা নিশ্চিত হয়েছে।

একাধিক সংকটময় পরিস্থিতিতে নিজের টিমকে সফলভাবে নেতৃত্ব দিয়েছেন পিও পিও সান। বিশেষ করে করোনা মহামারি এবং ভয়াবহ ভূমিকম্পের সময়। কঠিন ওই পরিস্থিতিতে তিনি সহকর্মী ও সদস্যদের পাশে থেকেছেন। এমনকি টিমের সঙ্গে খোলা আকাশের নিচে রাত কাটিয়ে নিশ্চিত করেছেন কেউ একা যেন এই সংকটের মুখোমুখি না হয়।

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে আঞ্চলিক সংঘাতের সময় বায়ামবাজে রুথ একটি সুপরিকল্পিত ধারাবাহিক কৌশল গ্রহণের মাধ্যমে রুবাবু ও মাহোকো শাখার কার্যক্রম সচল রাখেন, যার ফলে গ্রাহকদের কার্যক্ষেত্র সুরক্ষিত থাকে। এ ছাড়া যে সব এলাকায় কেউ কাজ শুরু করেনি, সেগুলো চিহ্নিত করে জরিপ পরিচালনা ও কার্যক্রম শুরুর জন্য তার টিমকে পরামর্শ দেন। বর্তমানে রুথ ১৭টি শাখার কার্যক্রম তত্ত্বাবধান করছেন, যা রুয়ান্ডায় সর্ববৃহৎ কার্যক্ষেত্র।

যেসব কাজে জবাবদিহির পাশাপাশি নির্ভুল থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, সেসব কাজে মেরি মনিকা বাঙ্গুরা অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রতিটি কাজে তিনি স্বচ্ছতা ও নির্ভুলতা বজায় রাখেন। শেখার প্রতি তার প্রচণ্ড আগ্রহ এবং ফলাফলকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে পরিবর্তনশীল সিস্টেমের সঙ্গে দ্রুত খাপ খাইয়ে নিতে পারেন। বিশেষ করে কঠিন পরিস্থিতিতেও তিনি সহকর্মীদের মধ্যে আস্থা এবং নির্ভরযোগ্যতার প্রতীক।