বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলগুলোতে এখনো নিয়মিতভাবে রাস্তার দুই ধারে কৃষি বর্জ্য, ঘরের আবর্জনা, বাজারের উচ্ছিষ্ট ও পলিথিনসহ নোংরা পানি ফেলার প্রবণতা চোখে পড়ে। এসব বর্জ্য শুধু যে গ্রামের সৌন্দর্য নষ্ট করে তাই নয়, মানুষের স্বাস্থ্য, খাদ্যনিরাপত্তা এবং জলবায়ুর ওপরও গভীর প্রভাব ফেলে।
পরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাবে কৃষি ও গৃহস্থালির জৈব বর্জ্য পচে উৎপন্ন হয় মিথেন গ্যাস, যা বৈশ্বিক উষ্ণায়নের অন্যতম কারণ। একই সঙ্গে এসব জায়গা মশা মাছি ও রোগজীবাণুর নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হয়। এর প্রভাব পড়ছে খাদ্য উৎপাদনেও। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন খাদ্য ও কৃষিপণ্যে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর ভারী ধাতুর উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
দেশে কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত নীতিমালা থাকলেও গ্রাম পর্যায়ে এর কার্যকর বাস্তবায়ন এখনো সীমিত। কোথায় বর্জ্য ফেলতে হবে বা কীভাবে সেগুলো ব্যবস্থাপনা করা যায় সে বিষয়ে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে এখনো স্পষ্ট ধারণা কিংবা অভ্যাস গড়ে ওঠেনি। গ্রামাঞ্চলের অধিকাংশ পরিবার তাদের জৈব ও অজৈব বর্জ্য আলাদা না করেই যেখানে-সেখানে ফেলতে অভ্যস্ত।
সহজ ও কম খরচের গ্রামীণ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা
বর্তমান বাস্তবতায় ব্র্যাকের জলবায়ু পরিবর্তন কর্মসূচি একটি সহজ, কম খরচের এবং কমিউনিটি-ভিত্তিক গ্রামীণ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার ধান্যহাটি গ্রাম এবং বাগেরহাটের মোংলা উপজেলার হলদিবুনিয়া গ্রামে চলছে এই কার্যক্রম। পাশাপাশি বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলা এবং বাগেরহাটের মোড়লগঞ্জ ও শরণখোলা উপজেলায় এই উদ্যোগ সম্প্রসারণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।

নিজ বাড়িতে দুটি আলাদা বিনে জৈব ও অজৈব বর্জ্য আলাদা করছে একজন গ্রামীণ নারী
এই উদ্যোগের মূল ধারণা হলো বর্জ্য তৈরির স্থানেই বর্জ্য আলাদা করা। এই কাজের জন্য প্রতিটি পরিবারকে দেওয়া হয়েছে দুটি ঢাকনাযুক্ত বালতি। কালো বালতিতে জৈব বর্জ্য এবং নীল বালতিতে অজৈব বর্জ্য সংগ্রহ করা হয়। জৈব বর্জ্য স্থানীয়ভাবে প্রক্রিয়াজাত করে জৈব সারে রূপান্তর করা হয়, যা কৃষিকাজে ব্যবহার হচ্ছে।

বাড়িতে উৎপাদিত জৈব বর্জ্য মাটির গর্তে ফেলা হচ্ছে, যা থেকে জৈব সার উৎপাদিত হবে।
এ জন্য গ্রামের ভেতর একটি কেন্দ্রীয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা শেড স্থাপন করা হয়েছে। স্থানীয়ভাবে গঠিত একটি কমিটি এবং স্বেচ্ছাসেবক দল নিয়মিত এই কার্যক্রম তদারকি করছে। তারা গ্রামবাসীকে সঠিকভাবে বর্জ্য পৃথকীকরণ, পুনর্ব্যবহারযোগ্য বর্জ্য সংগ্রহ এবং অজৈব বর্জ্য নিরাপদে সংরক্ষণের বিষয়ে দিকনির্দেশনা দিচ্ছে। পাশাপাশি এলাকায় সচেতনতা বাড়াতেও নিয়মিত প্রশিক্ষণ কর্মসূচি পরিচালনা করা হচ্ছে। এসব প্রশিক্ষণ গ্রামবাসীর মধ্যে পরিবেশবান্ধব আচরণ গড়ে তুলতে এবং বর্জ্য পোড়ানোর মতো ক্ষতিকর অভ্যাস কমাতে ভূমিকা রাখছে।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সম্ভাবনা
গ্রামীণ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা মডেলটির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর কম খরচ এবং সহজে বাস্তবায়নযোগ্যতা। স্থানীয় সম্পদ, স্বেচ্ছাশ্রম এবং কমিউনিটির সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে এটি পরিচালিত হচ্ছে, ফলে বড় অবকাঠামো বা ব্যয়বহুল প্রযুক্তির প্রয়োজন নেই। ইউনিয়ন পরিষদ, স্কুল এবং স্থানীয় সংগঠনের সঙ্গে সমন্বয় করে অল্প প্রশিক্ষণের মাধ্যমেই নতুন গ্রামগুলোকে এই ব্যবস্থার আওতায় আনা সম্ভব।
এই উদ্যোগের শুরু থেকেই প্রতি সপ্তাহে গড়ে ১৫-২০ কেজি প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে, যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। জৈব বর্জ্য বাড়ির পাশে তৈরি গর্তে ফেলে সার তৈরি করা হচ্ছে এবং অজৈব বর্জ্য কেন্দ্রীয়ভাবে সংগ্রহ করে স্থানীয় ভাঙারি দোকানে বিক্রির মাধ্যমে পুরো প্রক্রিয়াটি টেকসই করা হচ্ছে।

কেন্দ্রীয় গ্রামীণ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা শেড
পরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উপকারিতা
পরিকল্পিত গ্রামীণ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চালু হলে পরিবেশ পরিচ্ছন্ন থাকে, রোগের ঝুঁকি কমে, নিরাপদ পানি ও খাদ্য নিশ্চিত হয় এবং কৃষিতে প্রাকৃতিক সারের ব্যবহার বাড়ে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এই উদ্যোগ গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত পরিবেশবান্ধব আচরণ গড়ে তোলার একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করছে।
এই উদ্যোগের ফলে মানুষের মধ্যে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে উল্লেখ করে চিরঞ্জিত মণ্ডল বলেন, ‘এখন আমাগে পাড়ায় সবাই ময়লা এজাগা-ওজাগা ফেলাতি গেলি দুইবার ভাবে, ব্র্যাক ময়লা ফেলাতি সুন্দর একখান বাক্স বানায় দেছে, ওহনি ফেলায় সবাই ময়লা’

কেন্দ্রীয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা শেডে নির্দিষ্ট বিনে প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলছেন একজন গ্রামীণ নারী
বাসন্তীরাণী সমাদ্দার বলেন, ‘খ্যাতে বিষ দিয়ে, বিষির কৌটো যিখানে সিখানে ফ্যালায় রাখতাম। পানিতি মিশলি মাছ মইরে যাতো। আর ওসব তো পঁচে না, বীজ পুতঁতি গিলি বিটার সমস্যা বাধতো। এখন সকলের বাড়িতি ময়লা ফেলানোর বালতি দেছে, ওকিনি রাখি এইসব।’
পরিচ্ছন্ন পরিবেশ সুস্থ জীবন, নিরাপদ খাদ্য এবং টেকসই ভবিষ্যতের ভিত্তি। গ্রামীণ বর্জ্য ব্যবস্থাপনার এই উদ্যোগ সেই ভবিষ্যতের দিকেই একটি বাস্তব ও কার্যকর পদক্ষেপ।
নাহিন মাহফুজ সিয়াম ডেপুটি ম্যানেজার, জলবায়ু পরিবর্তন কর্মসূচি, ব্র্যাক
কামরান ইবনে আবদুল কাদের সিনিয়র স্পেশালিস্ট, জলবায়ু পরিবর্তন কর্মসূচি, ব্র্যাক



