Print this page
Last modified on Thursday, 29 April 2021 06:49

স্যার ফজলে হাসান আবেদের ডা. ইব্রাহিম স্মারক ভাষণ

Rate this item
(0 votes)

বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির অফিসার্স ক্লাব ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা স্যার ফজলে হাসান আবেদকে ইব্রাহিম স্মারক স্বর্ণপদকে ভূষিত করে। শিক্ষা, কৃষি, স্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা, পল্লী উন্নয়ন, ডায়রিয়া নিয়ন্ত্রণ তথা আর্থসামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ এই স্মারক স্বর্ণপদক প্রদান করা হয়। ২৯শে সেপ্টেম্বর ১৯৯৪ মরহুম ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিমের ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে বারডেম মিলনায়তনে ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিম স্মারক বক্তৃতা ও স্বর্ণপদক প্রদান অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। অনুষ্ঠানে স্যার ফজলে হাসান আবেদ স্মারক বক্তৃতা প্রদান করেন। বক্তৃতাটি পাঠকদের জন্য প্রকাশ করা হলো।

ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিম স্মারক ভাষণ প্রদানের জন্যে আমন্ত্রিত হয়ে আমি নিজেকে ধন্য মনে করছি। যেসব বিরল ব্যক্তিত্ব তাদের স্বপ্ন আর শ্রম, ত্যাগ আর তিতিক্ষা, সচেতনতা আর কর্তব্যবোধ দ্বারা এই বাংলায় আমাদের এই প্রজন্মের জীবনমান ও মূল্যবোধ উন্নততর করার বলিষ্ঠ প্রয়াস নিয়েছেন, ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিম তাদেরই একজন। বাংলাদেশের গর্ব এই অত্যাধুনিক হাসপাতালটি অথবা ইট-সুরকির অন্যকোনো সুরম্য অট্টালিকা অথবা সুবৃহৎ অবকাঠামোর মাঝে আমরা ডা. ইব্রাহিমের স্মৃতি সন্ধান করি না। তাকে আমরা আবিষ্কার করি, তাঁকে আমরা খুঁজে পাই এ দেশের মানুষের উন্নয়নকল্পে তাঁর সর্ববিধ চিন্তার গভীরে। কারণ তিনি কেবলমাত্র একজন স্বনামধন্য চিকিৎসকই ছিলেন না, ছিলেন না শুধু একজন নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষাবিদ, সুযোগ্য মন্ত্রী অথবা সুদক্ষ সংগঠক, তিনি ছিলেন সব মানুষের মাঝে একজন অনন্যসাধারণ মানুষ, যিনি আমাদের যাত্রাপথ আলোকিত করে গেছেন। তাই ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিম আমাদের ইতিহাসের একজন চিরবরেণ্য ব্যক্তিত্ব।

এটি আমাদের অনেকের সৌভাগ্য যে, কর্মব্যস্ত এই মানুষটির কর্মব্যাপ্তি এবং কর্মক্ষমতা কাছে থেকে প্রত্যক্ষ করার সুযোগ হয়েছে। এক অর্থে তিনি ছিলেন বাংলাদেশে আমার মতো আজকের হাজারও সমাজকর্মীর পূর্বসূরি। মানবউন্নয়নে অহেতুক সরকার নির্ভরতায় তিনি বিশ্বাসী ছিলেন না। তার গভীর বিশ্বাস ছিল যে, একজন নাগরিকের দাবি, তার নাগরিক দায়িত্ব থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। সমাজ উন্নয়নে তাই সদাসর্বদা সরকারের মুখাপেক্ষী হওয়া একটি স্বাধীন দেশের আদর্শ নাগরিকের ধর্ম হওয়া উচিত নয়।

আজ এই মঞ্চে দাঁড়িয়ে মনের গহনে সঞ্চিত এই অসাধারণ মানুষটির অনেক স্মৃতির মাঝে একটিরই কথা বলব। আজ থেকে প্রায় একযুগ আগে ১৯৮৫ সালের দিনগুলো আমার জন্যে ছিল অত্যন্ত কর্মব্যস্ত। ব্র্যাক তখন ডায়রিয়া নিরাময়ের সহজ চিকিৎসা, মুখে খাওয়ার স্যালাইন প্রস্তুত ও ব্যবহার পদ্ধতি গ্রামবাংলার প্রতিটি ঘরে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব নিয়েছে। আমার অফিসে এক ভোরে টেলিফোন বাজল। অপর প্রান্তে ডা. ইব্রাহিম। তিনি বললেন, গ্রামবাংলায় আমাদের ডায়রিয়াকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ড মনোযোগের সঙ্গে প্রত্যক্ষ করছেন। আমাদের কাজের প্রশংসা তিনি করলেন, করলেন উৎসাহব্যঞ্জক অনেক উক্তি। কিন্তু তার পরের প্রশ্নটিই ডা. ইব্রাহিমকে নিয়ে গেল সাধারণ একজন উৎসাহদাতার অনেক ঊর্ধ্বে। তিনি বললেন, আচ্ছা, বলুন তো, আমাদের বহুমূত্র চিকিৎসাজনিত নগরকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ডকে কীভাবে গ্রামবাংলায় ছড়িয়ে দেওয়া যায়? তিনি আমাকে এই হাসপাতালে তার সঙ্গে সাক্ষাতের আমন্ত্রণ করলেন। নিজে হাসপাতালটি তিনি আমাকে ঘুরিয়ে দেখালেন। আমরা তার উত্থাপিত সমস্যাটি সম্বন্ধে আলাপ-আলোচনা করলাম। বলাই বাহুল্য, তার প্রশ্নটির কোনো নিশ্চিত উত্তর আমার জানা ছিল না। আজও নেই, কারণ বহুমূত্ররোগ নিরোধ ও চিকিৎসা আর সাধারণ ডায়রিয়া বহুমূত্র রোগসম্পর্কিত বিষয়াদিতে ডা. ইব্রাহিমের অমূল্য অবদান আজ দেশদেশান্তরে সর্বজনবিদিত। আমার দৃষ্টিতে তাঁর এই সাধারণ প্রশ্নটি ছিল তাঁর পেশাগত জীবনের স্বপ্নপ্রসূত, তাঁর বহুযুগের পুঞ্জীভূত বাসনার অভিব্যক্তি, তাঁর আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ। এই প্রশ্নটিরই মাঝে আমরা দেখতে পাই একজন সাধারণ নাগরিক এবং একজন অসাধারণ মানুষের মাঝেকার যোজনের ব্যবধান।

ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিমের চিন্তাভাবনা আর ধ্যানধারণার কেন্দ্রে ছিল এ দেশের মানুষের জনস্বাস্থ্যের উন্নতি। আজ তাই এত গুণিজনের উপস্থিতিতে তার এই স্মারক সভায় জনস্বাস্থ্য সম্বন্ধীয় দুয়েকটি বিষয়ের অবতারণা করতে চাই।

আজ বিংশ শতাব্দীর এই অন্তিমলগ্নে এসে আমরা উপলব্ধি করি যে, এই অতিক্রান্ত শতাব্দীটি মানবসভ্যতার অগ্রগতির ক্ষেত্রে রেখেছে বিস্ময়কর অবদান। এই শতাব্দীতেই মানুষ শুধু যে উড়তে শিখল তা নয়, উড়ে বেড়াল অন্তরীক্ষে, পায়ে হাঁটল চাঁদের বুকে, আণবিক বিজ্ঞান আর প্রযুক্তিকে নিয়ে গেল সৃষ্টি আর ধ্বংসের একটি রোমাঞ্চকর পর্যায়ে। এই শতাব্দীতেই এভারেস্ট বিজয়ী মানুষ অতিক্রম করল মেরুদ্বয়।

স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে এই শতাব্দীতে আমরা লাভ করেছি অভাবনীয় প্রগতি। বিগত শতাব্দীর ভীতিদায়ক প্রাণনাশক সব মহামারি আজ বিগত দিনেরই ইতিহাস। কিন্তু একথা অনস্বীকার্য যে, মানুষের অগ্রগতির প্রায় সকল ক্ষেত্রেই বিশ্বের নাটকীয় এই বিবর্তন পাশ্চাত্যেই হয়েছে। পরিবর্তনের সকল হাওয়াই বয়েছে পাশ্চাত্য বিশ্ব থেকে। মানবস্বাস্থ্যক্ষেত্রে বিস্ময়কর অগ্রগতি তার ব্যতিক্রম নয়।

আমি মনে করি, স্বাস্থ্যক্ষেত্রে বিংশ শতাব্দীর অভূতপূর্ব উন্নতি সাধিত হয়েছে দুই কিস্তিতে। শতাব্দীর সূচনা থেকে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ অথবা পঞ্চাশের দশকের প্রারম্ভ পর্যন্ত রচিত হয়েছে সেই অগ্রগতির প্রথম ধাপ এবং তা হয়েছে পাশ্চাত্য বিশ্বে। তখনও প্রাচ্যের অধিকাংশ দেশই পরাধীন। সাম্রাজ্যবাদের অক্টোপাসের বাধন প্রাচ্যে তখনও হয় নি শিথিল। স্বাস্থ্যক্ষেত্রে আমরা তখনও মধ্যযুগীয়। আজ আমরা পাশ্চাত্য জগতে মানবস্বাস্থ্য সংরক্ষণে আর নিরাময় আবিষ্কারে যে যুগান্তকারী বিবর্তন প্রত্যক্ষ করছি, তার ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল স্বাস্থ্যক্ষেত্রে উন্নতির সেই প্রথম ধাপে, এই শতাব্দীর প্রথম পাচটি দশকে। সেই অর্ধশতকে আমাদের ভূখণ্ডে স্বাস্থ্যক্ষেত্রে উন্নতির হাওয়ায় তখনও পাল ধরে নি।

শতাব্দীর প্রথমভাগে পাশ্চাত্যে এই উন্নতি সাধিত হয়েছিল মানবস্বাস্থ্যের মান উন্নয়নের বিবিধ ক্ষেত্রে, বিশেষ করে রোগপ্রতিরোধক ব্যবস্থায় নতুন নতুন প্রবর্তনে। দুধ পাস্তুরিকরণ, পানিকে ক্লোরিনযুক্ত করা, উন্নততর পয়ঃব্যবস্থা, ব্যক্তি স্বাস্থ্যব্যবস্থার নিশ্চিতকরণ, সুষম খাদ্য এবং খাদ্যপচনরোধ বিষয়ে স্বাস্থ্য শিক্ষাদান, টিকা আবিষ্কার এবং তার ব্যবহার, সীমিত পরিবারের উপর গুরুত্ব প্রদান ইত্যাদি ঘটেছিল সেই সময়েই। বলাই বাহুল্য, এই যুগান্তকারী পরিবর্তনটি সাধিত হয়েছিল মানব কর্মকাণ্ডের বিকাশের এক অভূতপূর্ব সমন্বয়ের মাধ্যমে, যেখানে জনস্বাস্থ্য ক্ষেত্রে পুরোভাগে ছিলেন বিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদ, গবেষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী সমাজবিজ্ঞানীরা। অচিরেই তার প্রতিফলন পড়ল পাশ্চাত্যের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থায়। শিশু মৃত্যুহার, গৰ্ভজাত মৃত্যু, পুষ্টিহীনতা, জন্মহার সবই নাটকীয়ভাবে হ্রাস পেল । আর তার ফলে পাশ্চাত্যে স্থাপিত হলো বর্তমান অর্ধশতকের পরিবর্তনের ভিত্তি। এই শতাব্দীর প্রথমভাগে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা সুদৃঢ়করণের পর পাশ্চাত্য জগৎ তার দৃষ্টি নিবদ্ধ করল রোগ প্রতিকারের ওপর।

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ উত্তরকালে রচিত হলো বিশ্বের আধুনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার অবকাঠামো। স্বাস্থ্যক্ষেত্রে মূলত নতুন নতুন আবিষ্কার চিকিৎসার পথকে সুগম করল। পেনিসিলিন আবিষ্কার, নতুন অ্যান্টিবায়োটিকের উদ্ভাবন, শল্য চিকিৎসার ক্ষেত্রে অবিশ্বাস্য অগ্রগতি স্বাস্থ্যব্যবস্থায় করল একটি নতুন দিগন্তের উন্মোচন। পাশ্চাত্য জগতের সর্বত্রই গড়ে উঠল আধুনিক সুযোগসুবিধাসম্পন্ন নতুন হাসপাতাল আর স্বাস্থ্যকেন্দ্র। মানুষ লাভ করল অত্যাধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থার সর্ববিধ সুফল।

সেই সময়ে আমরা প্রাচ্যে ঔপনিবেশিক সরকারের অবসানে সবেমাত্র স্বাধীন হয়েছি। কিন্তু স্বাধীনতা লাভকালে আমাদের দেশসমূহে স্বাস্থ্যব্যবস্থা ছিল মধ্যযুগীয়। স্বাস্থ্যক্ষেত্রে সাম্রাজ্যবাদীদের আওতায় আমরা ছিলাম অন্ধকারাচ্ছন্ন একটি পরিবেশে। সেই পরিবেশে সম্ভব ছিল না কোনো অগ্রগতি, অসম্ভব ছিল একটি নতুন স্বাস্থ্যব্যবস্থার ভিত্তি নির্মাণ। এদিকে স্বাধীনতার সঙ্গেসঙ্গেই আমাদের মাঝে জাগরূক হলো দ্রুত পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সচেতনতাবোধ। সেই মুহূর্তে আমি মনে করি, আমরা অনেকেই স্বাস্থ্যক্ষেত্রে উন্নতির সোপানে দ্রুত আরোহণের জন্য এমন একটি পন্থা অবলম্বন করলাম, যা বহুলাংশে সঠিক ছিল না। আমরা রোগ প্রতিরোধের ব্যবস্থাদির ভিত্তি সুদৃঢ় না করে মনোনিবেশ করলাম রোগ প্রতিকারের ওপর, পাশ্চাত্য দেশসমূহের অন্ধ অনুকরণে। এই শতাব্দীর প্রথমভাগে বিশ্বস্বাস্থ্যব্যবস্থায় রোগপ্রতিরোধের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাদি গ্রহণ ডিঙ্গিয়েই যেন আমরা যেতে চাইলাম রোগ প্রতিকারের অঙ্গনে, পাশ্চাত্যের অনুকরণে আধুনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার উপযোগী হাসপাতাল ইত্যাদি স্থাপনের উদ্যোগে। আমরা আমাদের অনেক মেধাবী চিকিৎসকদের বিদেশে প্রেরণ করলাম বড় বড় ডিগ্রি লাভের জন্য। জনস্বাস্থ্যব্যবস্থার ভিত্তি রচনা না করেই আমরা রোগ প্রতিকারের অবকাঠামো অর্থাৎ আধুনিক হাসপাতাল আর স্বাস্থ্যকেন্দ্র স্থাপনায় নিয়োজিত হলাম। কিন্তু তখনও আমাদের মতো দেশগুলোতে জনস্বাস্থ্যব্যবস্থার অবস্থা ছিল ভয়াবহ। শুধু তাই নয়, আজ বিংশ শতাব্দীর এই অন্তিম লগ্নেও আমাদের দেশে শতকরা মাত্র ২০ ভাগ অথবা তার চাইতেও কম লোক রয়েছে স্বাস্থ্যসম্মত পয়ঃপ্রণালীর আওতায়, আমাদের অধিকাংশ মানুষ এখনও আয়োডিনযুক্ত লবণ ভক্ষণ করেন না, ব্যক্তিস্বাস্থ্য অর্থাৎ পার্সোনাল হাইজিন সম্বন্ধে আমাদের অধিকাংশ মানুষই এখনও উদাসীন।

তবে গত কয়েক বছরে জনস্বাস্থ্য  উন্নয়নক্ষেত্রে, আমাদের ভূখণ্ডে সন্তুষ্টিদায়ক কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। স্বাস্থ্যক্ষেত্রে হারানো এই শতাব্দীর প্রথম ৫০টি বছর, সঙ্কুচিত সময়ের মাঝে অতিক্রম করার প্রচেষ্টা বিবিধ ক্ষেত্রে পরিলক্ষিত হচ্ছে। গত ৬-৭ বছরের মাঝে আমাদের দেশে টিকাদানের হার জনগোষ্ঠীর ২ শতাংশ থেকে ৭০ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে ।

উন্নতির উচ্চ এই হারকে টিকিয়ে রাখা এখন হওয়া উচিত আমাদের নিরন্তর প্রচেষ্টা। পরিবার পরিকল্পনা ক্ষেত্রে আমাদের দেশে সরকারি এবং বেসরকারি উদ্যোগের সাফল্য আজ সর্বজনস্বীকৃত। গ্রামবাংলায় আমাদের দুর্বলতম জনগোষ্ঠী, নারী সমাজের সকল প্রকার উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য চলছে ব্যাপক প্রচেষ্টা। ব্র্যাকের কর্মী হিসেবে বাংলাদেশের ৩৫ হাজার গ্রামের প্রায় ২০ লক্ষ মহিলা আর শিশুকে সংগঠিত করার রোমাঞ্চকর কর্তব্যে নিযুক্ত থেকে বলতে পারি, দেশে আজ স্বাস্থ্য উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় একটি ভিত্তি আমরা স্থাপনে সক্ষম হচ্ছি। সার্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা এবং অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত মেয়েদের বিনা খরচে শিক্ষা প্রবর্তন করার আইন দেশে একটি উপযুক্ত শিক্ষাব্যবস্থার পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারবে বলে আমরা আশা করছি। কিন্তু আমাদের দেশে সমস্যা এমনই প্রকট যে, সক্রিয় বেসরকারি সাহায্য ছাড়া কেবলমাত্র সরকারের পক্ষে আইন প্রণয়ন করে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানো অসম্ভব। এবং শিক্ষা ব্যতিরেকে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়ন অসম্ভব। আপনারা অনেকেই অবগত আছেন, অন্যান্য বেসরকারি উদ্যোগের মাঝে ব্র্যাকও এই ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ নিয়েছে। দেশে আজ ব্র্যাকের ৩০ হাজার বিদ্যালয়ে শিক্ষারত রয়েছে গ্রাম বাংলার প্রায় ১০ লক্ষ দরিদ্র ঘরের শিশু। তাদের মাঝে শতকরা ৭০ ভাগ রয়েছে মেয়েশিশু।
 
সুধীবৃন্দ,
আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি যে, সংকুচিত সময়ে উন্নয়ন পথ অতিক্রম করার জন্য প্রয়োজন রয়েছে আমাদের উদ্ভাবনী ক্ষমতা, Capacity for Innovation বৃদ্ধি করার। জনস্বাস্থ্যক্ষেত্রে আমাদের দেশের বিদ্যমান সমস্যাগুলোকে যথাযথভাবে চিহ্নিত করার। উপযুক্ত প্রতিরোধক ব্যবস্থাদি গ্রহণ করার। বহুল ক্ষেত্রেই আমাদের সমস্যা নির্ণয়ে আমরা বহিরাগতদের ওপর প্রয়োজনের অতিরিক্ত আস্থা রাখি। তা অনুচিত। আমাদের যথার্থ সমস্যা চিহ্নিত করা এবং সমাধানের উপায় এবং পন্থা আবিষ্কারের দায়িত্ব আমাদেরই।

শৈশবে শুনেছি, 'যার হয় যক্ষ্মা, তার নেই রক্ষা'। এই কথাটি কে এদেশে বিগত দিনের কথা বলেই ধরে নেওয়া হয়। তবে গ্রামবাংলায় আমাদের অভিজ্ঞতায় আমি বলতে বাধ্য যে, যক্ষ্মার প্রকোপ থেকে আমাদের দেশের অনেক মানুষ আজও রক্ষা পায় না। অথচ নিয়মিত ওষুধ সেবনে যক্ষ্মার সম্পূর্ণ নিরাময় আজকাল অনায়াসে সম্ভব। যক্ষ্মা এদেশে যথেষ্ট পরিমাণে আজও বিদ্যমান, তবে এটা আজ এদেশে যেন একটি বিস্মৃত রোগ। তার কারণ হয়তো এই যে, রোগটি পাশ্চাত্যে আজ প্রায় সম্পূর্ণভাবেই অনুপস্থিত, যার ফলে এই রোগ প্রতিষেধনের ব্যবস্থা নিয়ে তাদের মাথাব্যথা কমই। অবশ্য ‘এইডস’ রোগটির কারণে পাশ্চাত্যে আবার যক্ষ্মার পুনরাবির্ভাব হয়েছে। তবে সে অন্য কথা।

আমাদের দেশে সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে যক্ষ্মারোগ নির্ণয় বিশেষ সমস্যাসঙ্কুল। কারণ আক্রান্ত ব্যক্তিরা প্রকাশ্যে তাদের যক্ষ্মা রোগ সম্পর্কে কিছুই ব্যক্ত করতে চান না। সেই যুগে যক্ষ্মা ছিল একটি শক্ত ব্যামো। তাই সেই রোগ চেপে যাওয়ার প্রবণতা সমাজে ছিল। আজ যখন রোগটির নিরাময় কঠিন নয়, এই রোগের ত্বরিত চিকিৎসা না করা অবশ্যই বাতুলতা। যক্ষ্মা রোগ থেকে সম্পূর্ণ নিরাময় আজকাল প্রায় নিশ্চিত হলেও সময়সাপেক্ষ। তাই প্রয়োজন রয়েছে এমন একটি চিকিৎসা ব্যবস্থা উদ্ভাবন করার, যা অনায়াসে গ্রহণযোগ্য এবং যার দীর্ঘস্থায়িত্ব রোগীর কাজে কোন প্রতিকূল অবস্থার সৃষ্টি করতে না পারে। যক্ষ্মারোগ নির্ণয়ে ব্র্যাকের অভিজ্ঞতা আজ প্রায় এক দশকের। আমাদের স্বাস্থ্যকর্মীরা আজ গ্রামবাংলার বিভিন্ন এলাকায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে থাকেন। তারপর আমরা সেই রোগীদের আমাদের চিকিৎসার আওতাভুক্ত করি। চিকিৎসার প্রারম্ভে রোগীকে একটি অঙ্গীকারপত্র স্বাক্ষর করতে হয় এই মর্মে যে, তিনি যথাযথ চিকিৎসা গ্রহণ করবেন। তার কাছ থেকে ২০০ টাকা জামানত রাখা হয়। আরোগ্য লাভের পর তাকে ফেরত দেয়া হয় ১৫০ টাকা এবং স্বাস্থ্যকর্মী লাভ করেন বাকি ৫০ টাকা। কিন্তু চিকিৎসা চলাকালীন চিকিৎসা ইচ্ছাকৃত বিরতি প্রদান করলে রোগীর পুরো জামানতটিই বাজেয়াপ্ত হয়।

১৯৮৪ সাল থেকে মানিকগঞ্জ থানায় আমাদের এই প্রকল্প কাজ করছিল। ১৯৯১-তে তা হয় আরও দশটি থানায় সম্প্রসারিত। এই বছর থেকে সরকারের সহযোগিতায় আরও ১০০টি থানায় এই কর্মসূচি গৃহীত হচ্ছে। আমি মনে করি, বাংলাদেশে বর্তমানে যক্ষ্মারোগ নিবারণের জন্য একটি বিরাটাকার কর্মসূচি গ্রহণের প্রয়োজন রয়েছে। আজকের আপেক্ষিকভাবে উন্নততর জনস্বাস্থ্যব্যবস্থা সেই পদক্ষেপ গ্রহণে সহায়কই হবে।
 
সুধীবৃন্দ,
দুর্ভিক্ষের মাঝে একটি বিয়োগান্তক নাটকীয়তা আছে, যা পুষ্টিহীনতার মধ্যে নেই। দুর্ভিক্ষে অল্পসময়ের পরিধিতে মৃত্যুবরণ করে ক্ষুধার্ত হাহাকারের মাঝে অনেক মানুষ। তাই দুর্ভিক্ষে মৃত্যু বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে, তার খবরাখবর বার্তামাধ্যমে আর পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এদিকে পুষ্টিহীনতায় যারা তিলে তিলে নিরবে মৃত্যুবরণ করে, তাদের হিসাব থেকে যায় অজানা।

আমার গ্রামবাংলার আড়াই দশকের অভিজ্ঞতায় আমি বলতে বাধ্য যে, পুষ্টিহীনতা আমাদের দেশের একটি প্রধান সমস্যা। আর সেই সমস্যার প্রধান শিকার আমাদের নারীসমাজ। তার কারণটি বোধকরি সামাজিক। সাধারণ একটি বিত্তহীন পরিবারেও অপ্রতুল খাবারের অবশিষ্টাংশ জোটে নারীভাগ্যে। স্বামী এবং পরিবারের অন্যদের খাবারের পর আসে গৃহবধূর খাবার পালা। আমাদের সমাজের রীতিনীতির ওতপ্রোত অংশ এটি। আর তারই অভুক্ত ভুক্তভোগী আমাদের দরিদ্র নারীসমাজ। অথচ গর্ভধারিণীর স্বাস্থ্য ভাবী প্রজন্মের স্বাস্থ্যমানকে গভীরভাবে প্রভাবান্বিত করে। গ্রামাঞ্চলে নারীসমাজের পুষ্টিহীনতাকে একটি প্রধান সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করার অভিমত আমি দৃঢ়ভাবে পোষণ করি। পুষ্টিহীনতা সম্বন্ধে সচেতনতা জাগ্রত করার আশু প্রয়োজন রয়েছে আমাদের দেশে। কিন্তু আজ গ্রামবাংলায় সর্বাধিক প্রয়োজন দারিদ্রবিমোচন এবং দরিদ্র মানুষের বিশেষ করে দুর্বল জনগোষ্ঠী, অর্থাৎ নারীসমাজের ক্ষমতায়ন। এবং আমি বিশ্বাস করি কেবলমাত্র নারীশিক্ষা এবং কর্মসংস্থানের মাধ্যমেই তা করা সম্ভব।

সুধীবৃন্দ,
আজ ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিমের এই স্মারক সভায় আরও একটি বিষয়ের কিঞ্চিৎ অবতারণা করতে চাই। এই দেশে স্বাস্থ্যবিষয়ক গবেষণার প্রতি ডা. ইব্রাহিমের ছিল দৃঢ় অঙ্গীকার। এই দেশে গবেষণাকে বিলাসিতা বলে আখ্যায়িত করার যে প্রবণতা রয়েছে, ডা. ইব্রাহিম ছিলেন তার ঘোর বিরোধী। তিনি যেমন বিশ্বাস করতেন, তেমনিভাবে আমাদের সবারই বিশ্বাস করা উচিত যে, গবেষণা এবং উন্নয়ন একে অন্যের পরিপূরক। এই হাসপাতালটির গবেষণা কার্যক্রম সৃষ্টিতে তাঁর উদ্যম আমাদের অনেকেরই অজানা নয়। জুরাইনে ডা. ইব্রাহিম গৃহীত প্রকল্প গবেষণার প্রতি তাঁর বিশ্বাসের একটি প্রকৃষ্ট নিদর্শন। জনস্বাস্থ্য উন্নয়নক্ষেত্রে আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলব, আমাদের ভূখণ্ডে স্বাস্থ্যক্ষেত্রে গবেষণার প্রয়োজনীয়তা আজ অত্যন্ত প্রকট। গবেষণা দুই প্রকারের। মৌলিক অর্থাৎ Basic research আর প্রায়োগিক বা Applied Research। প্রায়োগিক গবেষণার ক্ষেত্রে উন্নয়নগামী অনেক দেশেই আজ প্রগতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। কিন্তু একটি বিশেষ কারণে সেখানে আজ প্রয়োজন রয়েছে মৌলিক গবেষণার ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করার। পাশ্চাত্য জগৎ আমাদের তুলনায় আজ স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে অনেক উচ্চতর মার্গে। তাই আমাদের দেশের স্বাস্থ্যসমস্যা আজ তাদের সমস্যাবলি থেকে ভিন্নতর। তারা মৌলিক গবেষণা চালাচ্ছেন তাদের পরিধিতে, যা আমাদের এখনও ব্যাপকভাবে স্পর্শ করে না। পৃথিবীতে বছরে স্বাস্থ্যসংক্রান্ত গবেষণায় যে ৩ হাজার কোটি ডলার খরচ হয়, তার মাত্র পাঁচভাগ  ব্যয় হয় আমাদের মতো দেশের সমস্যাদি নিয়ে। বাকি ৯৫ ভাগ খরচ হয় উন্নত দেশগুলোর স্বাস্থ্যসমস্যার ওপর। শতকরা ৯৩ ভাগ প্রতিরোধযোগ্য ব্যাধি আজ কেবলমাত্র উন্নয়নশীল দেশগুলোরই সমস্যা। সেই জন্যেই আমাদের স্বাস্থ্য সমস্যাদির মৌলিক গবেষণার দায়িত্ব এখন একান্তই আমাদের। আমাদের সমস্যাবলি সমাধানের উপায় তাই খুঁজতে হবে আমাদেরই গবেষণার মাধ্যমে। মৌলিক গবেষণায় আত্মনির্ভরশীলতা, একবিংশ শতাব্দীর এই দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আমাদের নিশ্চিত করতে হবে।

আমার এক নাইজিরিয়ান বন্ধু আছেন। আদি লুকাস। তিনি বর্তমানে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। এই বিষয়ে তাঁর একটি মন্তব্য রয়েছে, যা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। তিনি বলেন, শারীরিক ব্যাধির বিরুদ্ধে আমাদের সংগ্রামের একটি ওতপ্রোত অংশ হচ্ছে গবেষণা। যুদ্ধ চলাকালীন যেমনি প্রয়োজন রয়েছে গোয়েন্দার, স্বাস্থ্য উন্নয়নে তেমনি প্রয়োজন রয়েছে গবেষণার। স্বাস্থ্যযুদ্ধে গবেষণা হচ্ছে গোয়েন্দা। স্বাস্থ্যযুদ্ধে গবেষণাই শত্রুকে চিহ্নিত করে, অস্ত্রযুদ্ধে যেমনি করে গোয়েন্দাবৃত্তি।
 
সমবেত সুধীবৃন্দ,
আপনারা ধৈর্য নিয়ে আমার বক্তব্য শুনলেন। তার জন্যে আপনাদের ধন্যবাদ। ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিমের মতো এ দেশের একজন সুযোগ্য সন্তানের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর যে–সুযোগটি আমাকে আজ দেওয়া হলো, তার জন্যে আমি কৃতজ্ঞ। আজ দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে আমাদের প্রয়োজন ছিল ডা. ইব্রাহিমের মতো নিবেদিতপ্রাণ একজন পথপ্রদর্শকের। এ-দেশের পলিমাটি থেকে কোনোদিন তাঁর পদাঙ্ক মুছে যাবে না। তাঁরই প্রদর্শিত পথে আমাদের যাত্রা অব্যাহত থাকুক, তাঁর অম্লান স্মৃতি আমাদের প্রেরণা জোগাক, তাঁর স্বপ্ন বাস্তবায়নে আমরা ব্রতী হই, এই হবে আজকের এই দিনে আমার একান্ত কামনা।

আপনাদের সবাইকে আমার আন্তরিক ধন্যবাদ।

Read 1380 times Last modified on Thursday, 29 April 2021 06:49

Latest from